২০২০ আমাদের জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথি করোনা ভাইরাস। সারা বিশ্ব স্থবির রাখছে এই ভাইরাস। তাই নিজেদের ইমিউনিটি সিস্টেম ঠিক রাখতে কম সময় ব্যয় করছি না আমরা। কেবল এই সময়েই নয়।নিজেদের সুস্থ রাখতে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ কিংবা নিয়মিত ঘুম এসব বিষয়ে আমরা সচেতন। কিন্তু এতো কিছুর ভিড়ে আমরা ভুলে যাই আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য বা মেন্টাল হেলথ ঠিক রাখবার বিষয়টি। ফলস্বরূপ প্রতিদিনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডিপ্রেশন রেট আর এর সাথে অন্যান্য মানসিক সমস্যা।
ডিপ্রেশন কি—
মানসিক স্বাস্থ্যর বিষয়ে সচেতন হওয়াটা খুব বেশি জরুরী। তার কারণ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর মাঝে অন্যতম ডিপ্রেশন,বিষণ্ণতা আর হতাশা। “আমেরিকান সাইক্রিয়াটিক অ্যাসোসিয়েশন (American Psychiatric Association)” এর মতে ডিপ্রেশন আর মন খারাপ এক নয়। ডিপ্রেশন একটি কমন এবং সিরিয়াস মেডিকেল ইলনেস। দীর্ঘ দিন স্থায়ী মন খাবাপ থাকাকে ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা বলে বিবেচনা করা হয়। ডিপ্রেশন একজন মানুষের আচরণ আর চিন্তাভাবনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এমনকি বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি হয় এর থেকে। “ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের (World Health Organization)” তথ্য থেকে জানা যায় বিশ্বে প্রায় ২৬৮ মিলিয়নের বেশি মানুষ ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতার শিকার।
অনেকেই ডিপ্রেশনকে আমলে নেন না কিন্তু এটি বাড়তে থাকলে সমস্যা বাড়তেই থাকে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয় ডিপ্রেশনে আক্রান্তদের একটি বড় অংশ সুইসাইডের পথে হাঁটেন। আর তুলে নিচ্ছেন নানান ভুল পদক্ষেপ।
ডিপ্রেশনের ও সুইসাইড—–
“ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের (WHO)” তথ্য অনুযায়ী প্রতিবছর ৮ লাখের বেশি মানুষ সুইসাইড করেন। তাদের বেশির ভাগই ডিপ্রেশনের শিকার। “সুইসাইড অ্যায়ারনেস ভয়েস অব এডুকেশন (Suicide Awareness Voice of Education)” থেকে জানা যায় আমাদের মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের (Neurotransmitters) চলাচল ও তথ্য আদান-প্রদানে এটি ভূমিকা রাখে। আর নিউরোট্রান্সমিশনের সময় সেরোটোনিন (Serotonin) এবং নোরপাইনফ্রাইন (Norepinephrine) রাসয়নিক ভারসাম্য ঠিক রাখার কাজ করে। কিন্তু ডিপ্রেশনের সময় রাসায়নিক ভারসাম্য ঠিক মত কাজ করে না। মূলত এর থেকেই সমস্যার সৃষ্টি হয়। রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতার ফলস্বরূপ ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হতে হয়। ধীরে ধীরে এ অসুখ বাড়তে থাকে চিকিৎসা না নিলে।
ডিপ্রেশনের শিকার অনেকেই তাদের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে জানান এ সময়ে তাদের মাঝে আসে ব্যপক পরিবর্তন। তাদের হতাশার মাত্রা বাড়তে থাকে। কল্পনা শক্তি লোপ পায়। সুন্দর ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা আর ভাবতে পারেন না। অতীতের সুন্দর সময়গুলো তাকে আর উদীপ্ত করে না। চিন্তা ভাবনাগুলো এলোমেলো হয়ে যায়। তারা নিজেরাই বুঝতে পারে না তারা অসুস্থতায় ভুগছে। এ সময় সব কিছু অসহনীয় হয়ে উঠে। চাইলেও তারা হতাশা থেকে মুক্তি পায় না । ঠিক এই সময়ে নানান ভুল পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেন তারা। না চাইলেও ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির জন্য কেবল মৃত্যু চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়। যেটি একটি চরম ভুল পদক্ষেপ।
যেকোন বয়সের মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় পরতে পারেন। এর কোন বয়স বা নিময় নেই। অন্য সব রোগের মত এটিও খুব স্বাভাবিক বিষয়। ভয় পাবেন না বরং দ্রুত চিকিৎসা নিন। আপনার সমস্যা শেয়ার করুন। বহু মানুষ সুস্থ হয়েছেন। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলুন। অন্যান্য রোগের মত এটিও একটি নিরাময় যোগ্য অসুস্থতা। নিজেকে বুঝুন কারণ দিন শেষে আপনি আপনার। আপনি নিজেকে Help করুন। নেতিবাচক ব্যক্তি আর নেতিবাচক চিন্তা এড়িয়ে চলুন।
আমরা কি করছি কি আর করতে পারি—–
ডিপ্রেশনে থাকা মানুষগুলো যখন তাদের মন খারাপের কথা বোঝাতে যায় আমরা এড়িয়ে যাই। আমাদের ভাষায় ডিপ্রেশন খুব Simple বিষয়। এটা নিয়ে পাত্তা না দেওয়াই ভালো। আর এরা যদি ডিপ্রেশন নিয়ে কোন ভুল পদক্ষেপ নেয় তখন তাদের আমরা এক কথায় বলে দেই তারা ভিতু, নিজেদের জীবনকে ভালো বাসতে পারে না। আরো নানা বাহানায় আমরা তাদের ভুল প্রমাণ করতে থাকি।
ডিপ্রেশন জিনিসটা নিয়ে আমাদের অনেকের khowledge নেই, তাই আমরা না বুঝে অনেক নেতিবাচক মন্তব্য করে ফেলি। কিন্তু ঠাণ্ডা মাথায় কি সব জেনে একবার ভাবছি যদি একটু এই ডিপ্রেশনের শিকার মানুষগুলোকে আমরা বুঝতাম তাহলে হয়তো অনেক প্রাণ বেঁচে যেত। এবং এই ফিরে আসা মানুষগুলোই হয়তো ডিপ্রেশন মুক্ত একটা সমাজ করতে পারতো। আর যদি এ বিষয়ে না জানুন তবে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন। কারণ আপনার নেতিবাচক মনোভাব অন্য কারোর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। এ মনভাবের জন্যই হয়ত আপনারই আপনজনের সাথে আপনার দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
যারা ডিপ্রেশনে আছেন ভুলেও নেতিবাচক ব্যক্তিদের কথাগুলো নিয়ে ভাববেন না। আবারো বলছি দিন শেষে আপনি কিন্তু আপনারই। আপনি জীবনে কি অর্জন করলেন এটা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে জীবনে টিকে থাকুন। কারণ, একবার টিকে গেলে আর হারতে হবে না। জীবনে ডিপ্রেশন আসা খুব স্বাভাবিক বিষয়। যখন আঁচ করতে পারবেন চুপ না থেকে চিকিৎসা নিন। সামান্য জ্বর আসলে চিকিৎসকের কাছে ছুটে গেলে ডিপ্রেশনে কেন নয়? এটা তো একটি স্বাভাবিক মনের অসুখ যা সবারই হতে পারে। Please speak up. আপনার সমস্যাগুলো শেয়ার করুন।
এই করোনার সময় অর্থনীতি কোন দিকে যাচ্ছে আমাদের কারোর অজানা নয়। আমরা সামনে চরম অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হতে পারি। ইতিমধ্য অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন,ব্যবসায় লসের সম্মুখীন হচ্ছেন আরো নানান সমস্যা তো আছেই। তাই মনোবল দৃঢ় করতে হবে। এ সময়ে ডিপ্রেশন, হতাশা, বিষণ্ণতা খুবই স্বাভাবিক। সামনের দিনগুলোর জন্য প্রস্তুত থাকুন। একজন অন্যজনের পাশে দাড়াতে হবে। করোনা শেষে আমাদের মনোভাব ঠিক করে দেবে সমাজ ব্যবস্থায় কোন নতুন মোড় আসবে কিনা। Last few months have been very tough for us, please don’t make it tougher.