দেশের টানেই অদ্রিকার বহুমুখী মানবিক কাজ করে চলা

অদ্রিকা এষণা পূর্বাশা। শহুরে আধুনিকতায় বড় হলেও, শহুরে বিলাসিতা তাকে আকর্ষণ করে না খুব একটা। খুব অল্প বয়সেই আরাম আয়েশের জীবন ছেড়ে গ্রামে-শহরে, পথে-প্রান্তরে কাজ করে যাচ্ছেন অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য। এ যুগে এসে এরকম ত্যাগের কথা শুনে গল্প মনে হলেও এটাই সত্যি। ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেফালন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এ লেভেলে পড়ালেখা শেষ করেন তিনি। এরপর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগ থেকে স্নাতক শেষ করে একই বিশ্ববিদ্যালয়েই স্নাতকোত্তর পড়ছেন ডেভেলপমেন্ট স্টাডিস নিয়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি স্কুল জীবন থেকেই সমাজ সেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত রেখেছেন নিজেকে।  বর্তমানে সামনের সারি থেকে তিনি নেতৃত্বদিয়ে যাচ্ছেন একাধিক সমাজসেবা ও উন্নয়নমূলক সংগঠনকে।

অদ্রিকা প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্ত আছেন ‘এএসজিপি’ (এলায়েন্স ফর সাস্টেইনেবল গ্রোথ এন্ড পলিসি) নামক একটি উন্নয়নমূলক সংগঠনে। এছাড়াও তিনি পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন ‘জেন্ডার জাস্টিস’ নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে। এই সংগঠনগুলো ছাড়াও সর্ব সাধারণের মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সে নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন ‘শান্তির ঠিকানা’ নামের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পেশাদার  মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দ্বারা সকলকে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করছেন তিনি।

কেনো এতো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে কাজ করছেন এই প্রশ্নের জবাবে অদ্রিকা বলেন, “ছোট থেকেই মনে হত আমি যদি নিজের জন্য বাঁচি,সেই জীবনটা তুচ্ছ। কিন্তু বড় জীবনের স্বাদ আমি তখনই পাব যখন আমি নিজেকে উৎসর্গ করতে পারব মানবতার কল্যাণে। যখন আমি দেশের জন্য নিবেদিত থাকতে পারব, আর অসহায় মানুষের মাঝে আশার আলো ছড়িয়ে দিতে পারব, তখনই আমার জীবন স্বার্থক হবে।”

কবে থেকে সাংগঠনিক জীবনের সূচনা এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “১৬ বছর বয়স থেকেই মানুষের জন্য কাজ শুরু করেছি। শুরুটা ছিল একটা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্বেচ্ছায় পড়ানো আর ছবি আঁকা শেখানো। সেখানে কয়েকজন অটিস্টিক শিশু ছিল, তাদের সাথে অনেকটা সময় কাটাতাম। এরপর নিজ উদ্যোগে প্রায় প্রতি বছরই ভালবাসা দিবসে এতীমখানার শিশুদের সাথে অল্প একটু সময় হলেও কাটানোর চেষ্টা করি। এই বিশেষ দিনে তাদেরকে কিছুটা হলেও আনন্দ দেওয়ার ক্ষুদ্র প্রয়াস প্রতি বছরই থাকে।”

অদ্রিকা এ পর্যন্ত কাজ করেছেন বাংলাদেশের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। কোথায় কোথায় এ পর্যন্ত কাজ করা হয়েছে, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বেশ কয়েক বছর হল অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষ করে চরাঞ্চলগুলোতে গিয়ে অসহায় মানুষদেরকে সাধ্যমত সাহায্য করার চেষ্টা করছি। তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছি। যেমন কুড়িগ্রামে নদী ভাঙনের কবলে পড়ে যারা গৃহহীন হয়েছেন তাদের বাসস্থান তৈরিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন  সরঞ্জাম দিয়েছি। শুধু তাই নয়, তাদের সুস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে স্যানিটারি ল্যাট্রিনও তৈরি করে দিয়েছি। পাশাপাশি, গেল কয়েক বছর ধরে বন্যাদুর্গত এবং শীতাক্রান্ত মানুষদের জন্য ত্রান সামগ্রী বিতরণ করছি। এবছর তীব্র ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও করোনা পরিস্থিতির জন্য সেই সকল অসহায় মানুষদের জন্য কিছু করতে পারছিনা। তবে ঢাকাতে যারা করোনা মোকাবেলায় সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে কাজ করছেন, যেমন ডাক্তার, নার্স এবং হাসপাতাল কর্মী যারা আছেন তাদের জন্য স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবারহ করেছি।”

এই কাজগুলো কিসের তাড়না থেকে করে চলেছেন, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি অনেক ছোট থেকেই স্কুল এবং বিভিন্ন জায়গায় প্রচণ্ড বুলি আর হ্যারেসমেন্টেরর শিকার হয়েছি। আর  তাই আমার চেষ্টা, যেন অন্যদের এই কষ্টগুলো থেকে একটু হলেও মুক্তি দিতে পারি । পাশাপাশি দেশ ও জাতির প্রতি নিজস্ব দায়বদ্ধতাও তীব্রভাবে কাজ করে আমার মাঝে। আমার মুল কাজ গুলোর মধ্যে কয়েকটি  হল জেন্ডার ইকুইটি, নৈতিক শিক্ষা,  সেক্সুয়াল হ্যারেসমেন্ট, ধর্ষণ এবং লিঙ্গ বৈষম্য নিয়ে কাজ করা। কারণ আমি চাই একটি সুস্থ্য সমাজ ও প্রজন্ম গড়ে উঠুক এই দেশে। সেই লক্ষ্যে গত কয়েক বছর হল এই সকল কিছুর বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি।”

এগুলো বাস্তবায়নে অদ্রিকা ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্পেইন, মানববন্ধন, সমাবেশ ইত্যাদি করেছেন। বিভিন্ন সময়ে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি র‍্যালিও করেছেন। এএসজিপি’র উদ্যোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন  কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এন্টি-সেক্সুয়াল হ্যারেসমেন্ট ট্রেইনিং দিয়েছেন প্রায় ৫৫০ শিক্ষার্থীকে। তাছাড়া জেন্ডার জাস্টিস-এর উদ্যোগে মাদ্রাগুলোতে লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে ট্রেইনিং দেওয়া, সাইবার সেক্সুয়াল হ্যারেসমেন্টের শিকার ভিকটিমদেরকে লিগ্যাল সব সহযোগিতা করার মত সাহসী কাজগুলো করে যাচ্ছেন তিনি।

এত ব্যস্ততার মাঝে অবসর পান কিনা, সেই সময়ে কি করেন, এই বিষয়ে তিনি বলেন, “আমার কাছে কাজ মানে জীবনের সাথে যুক্ত হওয়া, এবং যা করি সব ভালবাসা থেকেই করি। সেটা সাংগঠনিক কাজ হোক বা যে কোন কিছুই হোক। আমি বই পড়তে খুব ভালবাসি। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে গত দুই বছর ধরে নিয়মিত পাঠচক্রের ক্লাস করছি। পাশাপাশি একটু আধটু কবিতা, ছোট বার্তা এবং মাঝে মাঝে কিছু বিশ্লেষণধর্মী লিখা লিখি। আমি ৩ টি ভাষায় মূলত বাংলা, ইংরেজি এবং হিন্দিতে লিখার চর্চা চালিয়ে যাচ্ছি। সেই সাথে গত অনেক বছর ধরেই বেশ কয়েকটি জনরার নৃত্য পরিবেশনা করছি। ছবি আঁকারও অভ্যেস আছে কিছুটা। এত কিছুর পরেও আত্মরক্ষার জন্য গোজো রিয়ো কারাটে শিখছি। আপাতত ব্লু বেল্ট পর্যন্ত আছি। ভবিষ্যতে আরও দূরে যাওয়ার ইচ্ছে আছে।”

অদ্রিকা একটি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ‘Conference Paper on Electrically Facilitated Solar Cargo Hauler- A key to easy and safe transportation’ এর প্রধান অথার। এই প্রকাশনাটি ২০১৬ সালে অ্যামেরিকার ওয়াশিংটনে IEEE তে জিএইচটিসি (GHTC) কনফারেন্সে উপস্থাপনের পর তাকে ‘বেস্ট প্রেজেন্টার’ এবং ‘ওয়ান অফ দ্যা বেস্ট পেপার’-র সম্মান দেওয়া হয়। এটা বাংলাদেশ থেকে ঐ বছর একমাত্র পেপার ছিল যা ‘IEEE GHTC SIGHT’ ফান্ডিং পেয়েছিল। ২০১৬ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মডেল ইউনাইটেড ন্যাশন কনফারেন্সেও যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ‘ও’ লেভেলে ভাল ফলাফলের জন্য ডেইলিস্টার অ্যাওয়ার্ডসহ, বিশ্ববদ্যালয়ে কয়েকবার ভিসি এবং ডিন’স মেরিট তালিকায় তার নাম ছিল।

অদ্রিকার বহুমুখী কাজ এবং অর্জন সবাইকে বিস্মিত করে। এই প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের তার থেকে তার থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। পড়ালেখার পাশাপাশিও যে আরো অনেক কাজ করা যায় এবং অর্জিত বিদ্যা যে শুধু জীবিকার জন্য নয়, জীবনের জন্য কাজে লাগানো যায় তার সব চেয়ে বড় দৃষ্টান্ত অদ্রিকা। সব চেয়ে বড় যেই গুণটি অদ্রিকার তা হচ্ছে তিনি মানবিকতার একজন রোল মডেল। তিনি একজন নারী হিসেবে সামাজিক অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও এ পর্যন্ত যে সকল মানবিক কাজের নজির স্থাপন করেছেন তা থেকে সকলের অনুপ্রেরণা নেওয়া উচিৎ। ইচ্ছা থাকলে যে উপায় হয় তাই প্রমাণ করেছেন অদ্রিকা। এদেশে এমন আরো অদ্রিকা জন্ম হোক সেই কামনাই আজ সবার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *