মহাবিশ্বে সবচেয়ে উজ্জ্বল জিনিসটি কি?
আপনারা কি জানেন?
আমাদের মহাবিশ্বের সবথেকে উজ্জ্বলতম জিনিস কোনটি?
আপনাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো বলবে যে, আমাদের মহাবিশ্বের সবথেকে উজ্জ্বলতম জিনিস হলো সূর্য।
আপনিও যদি এরকম ধারণা পোষণ করে থাকেন, তাহলে আপনার ধারণা কিছুটা ভুল।
আচ্ছা, আমরা সাধারণত উজ্জ্বলতা কিসের উপর বিচার করে থাকি?
একটি বস্তু আমাদের চোখে যতটা দেখা যায়, আমরা সেই বস্তুটির উজ্জ্বলতা ততটাই মনে করি।
কিন্তু আসল ব্যাপারটা কিন্তু এরকম নয়।
আজ আমার লেখা এই ব্লগটিতে আপনারা উজ্জ্বলতা সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য জানতে চলেছেন, যার পরে উজ্জলতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা আপনাদের পালটে যাবে। তার সাথে আপনারা জানতে চলেছেন আমাদের বিশ্বে এখন পর্যন্ত দৃষ্টিগোচর হওয়া সবথেকে উজ্জলতম জিনিস কোনটি!
আপনি এবার একটু ভেবে দেখুন…
যদি আপনার থেকে ৩ ইঞ্চি দূরে একটি বাল্ব রাখা হয়, তাহলে সেটার উজ্জলতা কি সূর্যের থেকে বেশি লাগবে কি লাগবে না?
অবশ্যই আপনার কাছে তার উজ্জলতা অনেক বেশি লাগবে। তবে কি বাল্বটির উজ্জ্বলতা সূর্যের থেকেও বেশি?
একদম-ই না। অর্থাৎ, উজ্জ্বলতা দুরত্বের উপর ও নির্ভর করে। আমরা কতটা দেখতে পাচ্ছি, শুধুমাত্র সেটাই একমাত্র উজ্জলতার কারণ হয় না। দুরত্বটাও একটি কারণ হয়। অর্থাৎ একটি বাল্বকে আপনি ৩ ইঞ্চি দূর থেকে যত উজ্জ্বল দেখছেন, তা যদি সূর্যের দুরত্বে রাখা হয়, তবে বাল্বটির উজ্জলতাও আমাদের চোখে পরবে না।
আর এই উজ্জ্বলতা কে দুইভাবে বিচার করা হয়…
১. Apparent Magnitude. যার অর্থ হচ্ছে অবাস্তব উজ্জ্বলতা। এর উদাহরণ হচ্ছে, আমরা আকাশে তারা দেখি। তবে তার থেকে বেশি চোখে পড়ে চাঁদ। যার কি-না কোনো নিজস্ব আলো-ই নেই। কিন্তু তারা এত উজ্জ্বল হওয়া সত্ত্বেও আমরা তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক তারা কেবল খালি চোখে দেখি।
২. Absolute Magnitude. যার অর্থ হচ্ছে বাস্তবিক উজ্জ্বলতা। এর উজ্জ্বলতা পরিমাপের জন্য একটি স্কেল ব্যাবহার করা হয়। যেখানে যেই নক্ষত্রের বা বস্তুর মান মহাবিশ্বে যত কম, সেই বস্তু বা নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা তত বেশি। এখন আমরা যদি সূর্য উদাহরণ হিসেবে নেই, তবে এর বাস্তবিক উজ্জলতার মান হচ্ছে ৪.৮। তবে আমরা যদি আমাদের চোখে দেখা সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা কে উদাহরণ হিসেবে নেই, তবে জানলে জানা যায় এর বাস্তবিক উজ্জ্বলতার মান -১.৪৬। যা কি-না সূর্য থেকে ২২ গুণ বেশি উজ্জ্বল। এরকমটি হওয়ার কারণ আছে বটে। যার নাম কি-না সাইরিয়াস (SIRIUS)। এর কারণ হচ্ছে, সাইরিয়াস (SIRIUS) পৃথিবী থেকে ৮.৬ আলোকবর্ষ দূরে রয়েছে। আরো একটি তারা আছে, যার নাম R136a1। যার বাস্তবিক উজ্জ্বলতার মান -১২.৮৬। যা কি-না সূর্য থেকে ২৫৬ গুণ বড় এবং এটি সূর্য থেকে ৮৬ লক্ষ গুণ বেশি উজ্জ্বল। যদি এই তারাটি আমাদের সূর্যের জায়গা নিতো, তবে এই তারার উজ্জ্বলতা মূহুর্তেই আমাদের অন্ধ করে দিতো। তবে এখন আপনি যদি ভাবেন যে এটি-ই মহাবিশ্বের সবথেকে উজ্জ্বলতম তারা। তবে আপনি ভুল। কারণ যখন একটি বড় তারার মৃত্যু হয় তখন অনেক বড় বিস্ফোরণ ঘটে। যাকে বলে সুপারনোভা (Supernova) বা হাইপারনোভা (Hypernova). এই প্রক্রিয়ায় তারাটি যখন ফাটে, তখন সেটি এত উজ্জ্বলতার সাথে বিস্ফোরিত হওয়ার ফলে একটি শক্তিশালী আলোর বীম নির্গত হয়। যাকে বলা হয় গামা-রে বার্স্ট (Gama-Ray Burst). এই প্রক্রিয়াটি সাধারণ একটি তারার থেকেও উজ্জ্বল। এই প্রক্রিয়ার কিছু সেকেন্ডের মধ্যে যে শক্তি উৎপন্ন হয়, তা সূর্য সারাজীবনে উৎপাদন করবে।
এবার আসি আরো গুরুত্বপুর্ণ একটি বিষয় নিয়ে…
আমাদের সৌরজগতের কাছেই একটি তারা আছে যা কি-না অদূর ভবিষ্যতে বিস্ফোরিত হবে। আর এই বিস্ফোরণের কারণে প্রচন্ড শক্তিসম্পন্ন আলোর বীম নির্গত হবে। আগেই উল্লেখ করেছি, অতিরিক্ত আলো আমাদের চোখের জন্য ক্ষতিকারক। যা কি-না অন্ধত্বকেও আপন বানাতে পারে।
যে তারাটির নাম, WR 104. যা কি-না আমাদের পৃথিবী থেকে ৭৫০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। বিজ্ঞানীদের অনুমান হলো, তারার এই প্রক্রিয়াটিতে আলোর প্রতিফলন যদি ১০ সেকেন্ডের জন্যও আমাদের পৃথিবীতে এসে পড়ে তবে আমাদের পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের ২৫ শতাংশ ওজনস্তর নষ্ট হয়ে যাবে। যার ফলে অসংখ্য জীবপ্রজাতি ধ্বংস হয়ে যাবে।
তবে কি এটি-ই মহাবিশ্বের উজ্জ্বলতম জিনিস? মোটেই-না।
এর উত্তর জানতে হলে আমাদের চলে যেতে হবে সবচেয়ে অন্ধকার স্থানে। আর আমরা জানি মহাবিশ্বে সবথেকে অন্ধকার স্থান হচ্ছে ব্ল্যাক হোল (Black Hole)। অর্থাৎ একটি ব্ল্যাক হোল (Black Hole) যখন কোনো নক্ষত্রকে গ্রাস করে তখন তার চারপাশে যে শক্তি উৎপন্ন হয়, তা থেকে যে পরিমাণ উজ্জ্বলতা আসে তা মহাবিশ্বের সকল নক্ষত্রের উজ্জ্বলতাকেও হার মানায়। যখন ব্ল্যাক হোল (Black Hole) কোনো নক্ষত্রকে গ্রাস করে তখন ব্ল্যাক হোল (Black Hole) প্রচন্ড বলের মাধ্যমে নক্ষত্রের গ্যাস, ভর সহ সবকিছুই গ্রাস করে নেয়। যার পুরো কাজটি-ই করে এর চারপাশে ঘুরতে থাকা অ্যাক্রেশন ডিস্ক (Accretion Disk)। আর এই প্রক্রিয়াটি এতই দ্রুত হয় যা কি-না আমাদের কল্পনার বাইরে। আর আমরা আগেই জানি, কোনো গরম জিনিসের ঘর্ষণের জন্য বস্তুটি উজ্জ্বলতা পায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো লোহার ছুড়ি বা বটি যখন ধার দেয় তখন তা থেকে আলোর ফুলকি নির্গত হয়। আর ব্ল্যাক হোল (Black Hole) এর এই প্রক্রিয়াটিকেই বলা হয় কোয়াসার (Quasar). প্রথম দৃশ্যমান কোয়াসার (Quasar) এর নাম হলো 3C273. যার বাস্তবিক উজ্জ্বলতা ছিল -২৬.৭। যা কি-না আমাদের সূর্যের তুলনায় ৪ ট্রিলিয়ন গুণ বেশি উজ্জ্বল। আর আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির উজ্জ্বলতার ১০০গুণ বেশি উজ্জ্বল। এটি যদি আমরা পৃথিবীর ৩৩ আলোকবর্ষ দূর থেকে দেখতে পারি তবে সেটিকে সূর্যের মতো দেখাবে। যেখানে সূর্য পৃথিবী থেকে মাত্র ০.০০০০১৬০১৩ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। আমাদের পৃথিবী যদি কোয়াসার (Quasar) এর একটিভ গ্যালাক্টিক নিউক্লিয়ার রেঞ্জের মধ্যে পড়ে তবে সে কোয়াসার (Quasar) কেই বলা হয় ব্লাজার (Blazar). আর এখনো অবধি আবিষ্কৃত সবথেকে উজ্জ্বল প্রক্রিয়া হলো, Blazar 3C 454.3. যার বাস্তবিক উজ্জ্বলতা -৩১.৪। আর আগেই বলেছি, উজ্জ্বলতার মান যত কম, উজ্জ্বলতা ততো বেশি।
এবার চিত্রটির দিকে লক্ষ করি, ডান পাশের যে তারাটি দেখা যাচ্ছে তা আমাদের পৃথিবী থেকে ১০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। আর বাম পাশের যে আলোটির আকার এবং উজ্জ্বলতা তারাটির সমান লাগছে সেটি আসলে একটি কোয়াসার (Quasar). যা কি-না ৯০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত।
এখন আপনার প্রশ্ন হতে পারে, এই কোয়াসার (Quasar) গুলি এতটা দূরে হয় কেন!
এর উত্তর হচ্ছে, এই কোয়াসার (Quasar) গুলির জন্ম হয়েছিল কয়েকশ কোটি বছর আগে। আর তখন এই মহাবিশ্ব একদম নতুন অবস্থায় ছিল। অর্থাৎ এখন আমরা কোয়াসার (Quasar) এর যে আলোটি দেখতে পা-ই তা মোটেও বর্তমান নয়। কোয়াসার (Quasar) এর এই আলো প্রতিফলিত করে আসতে আসতে এত সময় হয়ে গেছে। অর্থাৎ আমরা অতীতের আলোকেই এখন দেখতে পাচ্ছি। আর এই যাত্রাকাল কোয়াসার (Quasar) এর জীবনকালের থেকেও বেশি হয়ে থাকে। মহাবিশ্বের যে কোনো স্থানেই কোয়াসার (Quasar) জন্ম নিতে পারে। এমনকি ৩০০-৪০০ কোটি বছরের মধ্যে এখানেও কোয়াসার (Quasar) জন্ম নিতে পারে। যখন মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি (Milky Way Galaxy) আর এন্ড্রোমেডা গ্যালাক্সি (Andromeda Galaxy) একসাথে মিলে যাবে তখন দুটি গ্যালাক্সির মধ্যে থাকা সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল একসাথে মিলে একটি কোয়াসার (Quasar) জন্ম দেয়ার উপযুক্ত হয়ে যাবে। যার উজ্জ্বলতা আমরা দেখার সৌভাগ্য বা দূর্ভাগ্য আমাদের হবে না।
সূত্রঃ গুগল, উইকিপিডিয়া, নাসা সহ আরো ট্রাস্টেড কিছু সংস্থার ওয়েবসাইট।