এইসব দিন রাত্রি আর ভালো লাগছে না। হাওয়া বদলের জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে আসলাম। রাস্তা-ঘাট নিরিবিলি, যেন কোথাও কেউ নেই। আকাশ মেঘের ছায়াতে ছেয়ে গেছে। মেঘ বলছে যাব যাব, তাও যাচ্ছে না। এই আমি একা একাই হেঁটে যাচ্ছি। এমন ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঝিঁঝিঁ পোকা গুলো আমাকে ঘিরে জ্বলছে। আমি হাঁটছি আনমনে। হাঁটতে হাঁটতে বড় একটি দেয়ালের সামনে এসে থামলাম। ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম সেটি আসলে দেয়াল না, দরজা। দরজার ওপাশে কে যেন দাঁড়ানো। আরেহ! এই তো হিমু! আমার হিমু মামা। মামার ডান হাতে একটি কাঠপেন্সিল, বাম হাতে একটি বই; মিসির আলি সমগ্র। মামা আমাকে দেখে জানালেন তিনি নাকি আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। আমি তাকে আমাকে সঙ্গ দেওয়ার প্রস্তাব করলাম। তিনি আমার হাতে তোমাদের এই নগরে বইটি দিয়ে বললেন, “আজ আমি কোথাও যাব না।” হিমু মামার কাছে থেকে বিদায় নিয়ে আমি আবারও উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটা শুরু করলাম। নিজেকে কবি কবি লাগছে। আমি ছাড়া রাস্তায় আর কোনো দ্বিতীয় মানব নেই। এভাবে কত ক্রোশ হাঁটলাম তা মনে নেই। হঠাৎ তাকিয়ে দেখলাম গৌড়িপুর জংশন এ এসে পরেছি। এইতো এই রাস্তা ধরে সোজা গেলেই শঙ্খনীল কারাগার আর তার আরেকটু ডানে হোটেল গ্রেভার ইন। এই হোটেলে যাওয়ার জন্য কত-শত পরিকল্পনা ছিলো নবনী আর রুমালীর। অতীততের স্মৃতি ভেসে উঠলো। আমরা বান্ধবীরা নবনীকে কুহুরাণী আর রুমালীকে লীলাবতী বলে ডাকতাম, অবার ওরা আমাকে রূপা বলে ডাকতো। একবার পরিকল্পনা হলো হোটেল গ্রেভার ইন এ যাব, আমাদের সাথে ট্যুর গাইড হিসেবে যাবে হিমু মামা। কিন্তু হঠাৎ হিমু রিমান্ডে থাকায় আর যাওয়া হয়নি। অবশ্য হিমু মামা রিমান্ড থেকে আসার পর আমাদের আয়না ঘর আর মেঘের ওপর বাড়ি দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন।
এতোক্ষনে মেঘ সরে গিয়েছে। চাঁদের আলো দেখে আমার জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প মনে পড়লো। আমি হেঁটেই চলছি, পথ যেন শেষই হচ্ছে না। চারপাশের পরিবেশে মনে হচ্ছে I’m in blissful hell. সামনে একটি নদী, ঘাটে পারাপার এর জন্য একটি নৌকা। নৌকায় কে যেন বসে আছে৷ জ্যোৎস্না আলোতে দেখে মনে হলো হুমায়ুন আহমেদ। কাছে যাব এমন সময় বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। বাহিরে আজান দিচ্ছে। আমি উঠে বসলাম। মোবাইল হাতে নিলাম সময় দেখার জন্য। ভোর ৪.৪৫ বাজে, নিচে ছোট করে আজকের তারিখ দেওয়া ; ১৩/১১/২০।
শুভ জন্মদিন হুমায়ুন আহমেদ।