‘ঘরে বসে আয় করুন ১০-১২ হাজার টাকা প্রতিদিন’
‘কাল-ই আয় করলাম ১০ হাজার টাকা’
‘৫ মিনিটে লোগো ডিজাইন করে আয় করুন লক্ষ লক্ষ টাকা’
‘আমার কবিরাজি, দেখাবে কারসাজি। কর আয়, বসে সোফায়।’
বাস, মক্কেল হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ। হয়ে গেল এক মধ্যবিত্তের জানা নেই, শোনা নেই, অনলাইনে পদার্পণ।
আহা, কি জীবন।
এর পর কত শত ভিডিও দেখে মোটিভেটেড হয়ে নেমে পড়ে ফ্রিল্যান্সিং এ।
অতঃপর, হ্যাশট্যাগ ফ্রিল্যান্সার…
এসব ভিডিও বা ব্লগ পড়ার পরে মনের মধ্যে অনুভুত হয়। আহা, লক্ষ লক্ষ টাকা। ভাবতেই কেমন কেমন জানি লাগে!
এরপর দু-একটা ভিডিও দেখে অনলাইনে মার্কেটপ্লেসে একাউন্ট খুলে বসা।
এখন সে বের হয় রাস্তায়, অলিতে-গলিতে। যখন কেও জিজ্ঞেস করে, এই ছেলে রাস্তায় ঘুরো কেন!
-কমুনা, আমার শরম করে। তবুও কইতাছি, কাওরে কইয়েন না কিন্তু। আমি, আমি আসলে একটা ফ্রিল্যান্সার।
চলুন এবার এই ফ্রিল্যান্সিং নামক সাগরের ডুবুরি হয়ে যাই…
- ফ্রিল্যান্সিং কি?
Free এবং Lance এই দুইটি শব্দের সমন্বয়ে আসে ফ্রিল্যান্স শব্দটি। যার ভাবার্থ দাঁড়ায়, যারা কোনো কাজ কোনো চুক্তিভিত্তিকভাবে করেনা। সম্পূর্ণই তাদের খেয়াল খুশিমত চলতে পারে। এবং কারো অধীনে থাকে না। আর কাজটি যারা সঠিকভাবে করতে পারে তাদেরকে বলা হয় ফ্রিল্যান্সার। যার প্রসার বাড়তে থাকে ১৯ শতকের দিকে।
- কীভাবে সফল ফ্রিল্যান্সার হওয়া যায়?
সঠিক দক্ষতা, রিসার্চের ক্ষমতা, কোনো কাজের ভার একা নেয়া, নিজের মধ্যে নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারলে তবেই সফল ফ্রিল্যান্সার হওয়া সম্ভব।
এবার আসল কথায় আসি… কেন আমাদের দেশে এত এত ফ্রিল্যান্সার হওয়া সত্ত্বেও এত মানুষ বেকার!
আমরা দক্ষতা অর্জনের ব্যাপারটাই প্রথমে ভুলে যাই!
ধরুন, আপনি এরকম একজন ফ্রিল্যান্সার। আপনি ডিজাইন করেন, ফাইভারে একাউন্ট ও খুলে রেখেছেন পাঁচ ডলারে লোগো ডিজাইন করে দিবেন বলে। আপনি ২-৩ মাস পর কাজ ও পেলেন। এরপর?
এরপর আপনি ক্লায়েন্ট এর ব্রিফ পড়লেন। আসলে পড়েননি! শুধু খুজেছেন, কি নামের লোগো চেয়েছে! আর কি টাইপের লোগো চেয়েছে! ধরুন, রিয়েল এস্টেট লোগো চাইলো। আপনি গুগোলে গিয়ে রিয়েল এস্টেট লোগো লিখে সার্চ দিবেন, একটা আইকন কপি করবেন, নিচে কোনো একটা ফন্ট না বুঝেই ইউজ করে দিবেন, কিছু ঝাকানাকা কালার দিয়ে জুড়ে দিবেন। বাস, হয়ে গেলো পাঁচ ডলারের লোগো! ক্লায়েন্ট আরো কয়েকটা কন্সেপ্ট চাইলো। আরো কিছু আইকন কপি করা শেষ। বাস, একটা নিয়ে চলে গেল ক্লায়েন্ট। ভাগ্য ভালো হলে ফাইভ স্টার পেয়ে গেলেন। এখন বলে বেড়াবেন আমি ফ্রিল্যান্সার।
এবার একে একে ভুল গুলোকে চিহ্নিত করা যাক…
- আমরা আর কিছু না পারি, দ্রুত বড় হওয়ার সুযোগ খুঁজি শুধু। যত শর্টকাট পথ অবলম্বন করা যায়, ততই আমরা নিজেদের ধন্য মনে করি।
- আমরা গুটিকয়েক বাংলা কন্টেন্টে অভ্যস্ত। ৫-১০ মিনিটের ভিডিও দেখে পুরো জিনিস বুঝে ফেলার চেষ্টা করি। যাকে প্রমিত বাংলায় বলে, এক লাইন বেশি বোঝা। বড় কোনো কন্টেন্ট পড়ে দেখতে চাই না। বই পড়ার অভ্যাস অনেকাংশে কমে গেছে বলে মানতেই হবে।
- নিজ দায়িত্বে গুগল করি না। ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ, ইমো, টিকটক, ইউটিউব এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ আমরা। এরা যা বলে, তা-ই আমাদের বোধগম্য হয়। সত্যতা যাচাইয়ের সময়-ই বা কোথায়।
- ধৈর্য বলতে কোনো জিনিস আবিষ্কার হয়নি বলেই মানতে হবে বোধ হয়। ধৈর্য ধরে কোনো জিনিস-ই করতে পারি না আমরা। কথাটা প্রথম পয়েন্টের সাথেও যায়। তবুও আলাদা করে বলা।
- ফ্রি-তে সব করতে চাই। ফ্রিল্যান্সিং করতে চাই, কিন্তু কোনো কোর্স করতে রাজি না। আবার যথাযথ রিসার্চ করার ও দক্ষতা নেই।
- এত কিছুর মাঝে হুজুগে ইন্সটিটিউশন গুলো কেন বাদ যাবে! দুধে ধোয়া তুলসিপাতা-ও তারা না! অনেক ছাত্রদের ডলারের লোভ দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়ার উদাহরণ অজস্র! ভাবছেন, কোথায়! ভাই, সেগুলো পত্রিকায় দেখায় না। কাগজের এপিঠ কেবল আমরা দেখি। যাতে চ্যানেল বা পত্রিকা তাদের টি.আর.পি বাড়াতে পারে। ওপিঠের ঘটনা আরো পীড়াদায়ক! এই ইন্সটিটিউশন এর থেকে বের হওয়া বেশিরভাগ-ই থাকে মধ্যবিত্ত। যার ফলে এদের পথে বসা ছাড়া-ও রাস্তা থাকে না।
- সঠিক পথ দেখানোর মতো মানুষের-ও অভাব রয়েছে এদেশে। হলফ করে বলতে পারি, বেশিরভাগ (সবাই বলছি না) মেন্টর-ই কেবল মার্কেটিং এর উদ্দেশ্যে তাদের পথ দেখায়। কিন্তু যারা আসলেই ফ্রিল্যান্সিং-এ ডুবে রয়েছে, তাদের অত সময় হয় না। তারা এক কাজ শেষ হলে নতুন কাজের আশায় থাকে। সে কাজ থেকে যা অর্থ আসে তা দিয়ে নিজের ব্রান্ড কিভাবে অগ্রসর হবে তা ভাবে। এদেশে চিপ মার্কেটিং এর যথেষ্ট উদাহরণ রয়েছে।
- ভাষা শিক্ষা, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। আমরা ফ্রিল্যান্সিং করতে নামি, তবে যে দেশ থেকে ক্লায়েন্ট খুজবো সে দেশের ভাষা সম্পর্কেই অভিজ্ঞতা নেই। ইংরেজি ভাষা সবচেয়ে প্রেফারেবল। কারণ এটি আন্তর্জাতিক ভাষা। তবে একটা বিষয় আছে, মাদ্রাসার ছাত্ররা এদিক দিয়ে এগিয়ে গেছে। কারণ একটাই, ওদের আরবি এর দক্ষতা তুঙ্গে। যার ফলে আরব কুয়েত সহ বিভিন্ন দেশ থেকে খুব সহজেই এরা কাজ নিতে পারে। এদের ইংরেজিতে দক্ষতা-ও তেমন লাগে না। তবে সে প্রসঙ্গ আলাদা। হলফ করে বলতে পারি। অনেকেই তুমুল ইংরেজি প্যারাগ্রাফ লিখতে পারে। রচনা লিখতে পারে। আরো কত কি! কিন্তু ইংরেজি বলতে যাও। যা বাবা, আমি গেলাম। কনভার্সেশন বা কথোপকথন করার দক্ষতা রাখার বিন্দুমাত্র চেষ্টা এরা করে না। করে! তবে এরকম.. হাই, হ্যালো, হাউ আর ইউ?, আই অ্যাম ফাইন, ইউ?, মি টু। এগুলো আমাদের শিক্ষা ব্যাবস্থায় ইংরেজিতে লিখার জন্য ডায়লগ। অন্যকিছু না।
- এবার আসে কাজের বাজেট রেঞ্জ নিয়ে। এদের এদেশের স্টেশনারি লেভেলের পাইকারি খুচরা বিক্রেতাদের মতো চিন্তা ভাবনা। যত কম দেয়া যায়, কিন্তু কাস্টমার ছাড়া যাবে না। এরপর আর কি! আকাশ ভরা তারা। যে কোনো সার্ভিসের স্ট্যান্ডার্ড রেট-ই ছেড়ে দেয় ব্যবসা করতে গিয়ে।
এরকম আরো অনেক কারণ আছে। ফ্রিল্যান্সিং এর যতগুলো সার্ভিস আছে। তার সিংহভাগ-ই ভার্সিটি থেকে গ্রাজুয়েশন নিয়ে কমপ্লিট করতে হয়। কিন্তু এর জন্য সময় আমাদের হাতে নেই। ব্যাক-আপ তো আরো নেই।
সবশেষে বলবো, যেই কাজ-ই হোক। যথাযথ রিসার্চ ছাড়া করা, আর পাতি ছাড়া চা বানানো এক সমান।
হ্যাপি ফ্রিল্যান্সিং।